গদ্য যদি হয় একটি বাড়ি, তবে কবিতা হলো সেই জ্বলন্ত মানুষটি: অ্যান কারসন
শিল্পকে আমি নিরাময়ের মাধ্যম মনে করি না: অ্যান কারসন
৬ মিনিটে পড়া

কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্যের (ক্ল্যাসিকস) অধ্যাপক অ্যান কারসন। জন্ম ১৯৫০ সালে অন্টারিওতে। আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক তিনি। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পৌরাণিক উপাদানের সঙ্গে আধুনিক নান্দনিকতার সমন্বয় সাধনে তার ভূমিকা রয়েছে। সুইডিশ একাডেমি ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয় অ্যান কারসনকে। পুরস্কার ঘোষণায় বলা হয়, ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে তার সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্ম সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ সৃষ্টি করেছে।
কারসনের সাহিত্যিক অবদানের অন্যতম দিক হলো গদ্য-পদ্য, কবিতা-উপন্যাস এবং অনুবাদ-সমালোচনার প্রচলিত বিভাজন ভেঙে দেওয়া। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ এবং ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজবেন্ড’ বিশ্বসাহিত্যে পদ্য-উপন্যাসসহ সংকর সাহিত্যরীতির চর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে। ধ্রুপদী সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে তিনি সফোক্লিস, ইউরিপিডিস ও সাফোর রচনা পুনর্পাঠ ও অনুবাদের মাধ্যমে প্রাচীন সাহিত্যকে সমকালীন পাঠকের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন। নোবেল পুরস্কারের পাশাপাশি তিনি টি. এস. এলিয়ট প্রাইজ, গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ এবং ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ অর্জন করেছেন।
২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর সাহিত্য-সাংবাদিক ও সমালোচক কেট কেলওয়ের নেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল অ্যান কারসনের কবিতার বই ‘ফ্লোট’ প্রকাশের পরপরই।
প্রশ্ন: আপনার নতুন কবিতাবই ‘ফ্লোট’ ব্যতিক্রমী ও সুন্দর প্রকরণের। এর গঠনশৈলী নিয়ে কিছু বলবেন?
অ্যান কারসন: ‘ফ্লোট’ মূলত একটি স্বচ্ছ খাপে রাখা ২২টি স্বতন্ত্র ছোট বইয়ের সমাহার, যা যেকোনো ক্রমে সাজিয়ে পড়া যায়। এগুলো মূলত পারফরম্যান্স পিস হিসেবে আলাদা আলাদাভাবে লেখা ও উপস্থাপন করা হয়েছিল, অনেক সময় অন্য শিল্পীদের সঙ্গে মিলে। তাই এটি একক কোনো অখণ্ড রচনা নয়; নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ক্রমানুসারে পড়ার জন্য এটি তৈরি হয়নি, যেমনটা আমার আগের বইগুলোতে ছিল। এর ভেতরের প্রতিটি লেখারই কিছু না কিছু অংশ আমার পছন্দ, আর কিছু লেখা পুরোটাই আমার প্রিয়।
প্রশ্ন: আপনার কাজ কবিতার প্রচলিত ধারণাকে অনেক দূর প্রসারিত করে। কবিতা আসলে কী? আপনার কি নিজস্ব কোনো সংজ্ঞা আছে?
অ্যান কারসন: গদ্য যদি হয় একটি বাড়ি, তবে কবিতা হলো সেই জ্বলন্ত মানুষটি, যে তীব্র গতিতে সেই বাড়ির মধ্য দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন: কবিরা কি নিজেদের ইচ্ছায় কবি হন, নাকি কবিতা নিজেই তাদের বেছে নেয়?
অ্যান কারসন: আমি আসলে ছবি আঁকতেই বেশি ভালোবাসতাম, কিন্তু তাতে খুব একটা পারদর্শী ছিলাম না। আঁকা ছবির নিচে শিরোনাম লিখতে গিয়েই ধীরে ধীরে তা লেখার রূপ নিতে শুরু করে। তবে সামগ্রিকভাবে ছবি আঁকার সঙ্গে লেখালেখির খুব একটা সরাসরি সম্পর্ক নেই; তবে তারা একে অপরকে সজীব করে তোলে, মগজ ব্যবহারের দুটো ভিন্ন পথ মাত্র।
প্রশ্ন: আপনার শৈশব কোথায় কেটেছে? আপনার বাবা-মা কী করতেন?
অ্যান কারসন: ওন্টারিওর নানা ছোট ছোট শহরে আমার শৈশব কেটেছে। বাবা ব্যাংকে চাকরি করতেন, মা ছিলেন গৃহিণী।
প্রশ্ন: আপনার জীবনের একদম শুরুর দিকের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
অ্যান কারসন: আমার সবচেয়ে শুরুর স্মৃতিটি আসলে একটা স্বপ্নের। আমার বয়স তখন তিন বা চার বছর, তখন যে বাড়িতে থাকতাম, সেই বাড়ির কথা। স্বপ্নে দেখলাম আমি দোতলার ঘরে ঘুমিয়ে আছি, তারপর ঘুম ভাঙল, নিচে নেমে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ালাম। চারপাশ নিঝুম আর খালি হলেও আলো জ্বলছিল। আমাদের সেই চেনা গাঢ় সবুজ সোফা আর চেয়ারগুলো হালকা সবুজ দেয়ালের পাশে যথাস্থানেই রাখা ছিল। একেবারেই আমার চিরচেনা ড্রয়িংরুম, কোনো কিছুই অগোছালো ছিল না। অথচ কেমন যেন গভীর ও নিশ্চিত একটা পরিবর্তন ছিল তাতে, বাহ্যিক রূপ একই থাকলেও ঘরটি যেন সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে এক উন্মত্ত রূপ নিয়েছিল।
প্রশ্ন: এটা তো অনিশ্চয়তা বা অবিশ্বস্ততার এক স্বপ্নের মতো শোনাল। কবি হিসেবে আপনার জীবনের তুলনায় ধ্রুপদী সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে জীবন কি বেশি স্থিতিশীল?
অ্যান কারসন: সত্যি বলতে, এই নির্ভরযোগ্যতা বা স্থায়িত্ব নিয়ে আমি কখনোই ভাবিনি।
প্রশ্ন: ‘লন্ডন রিভিউ অব বুকস’-এ স্টিফেন বার্ট আপনাকে নিয়ে লিখেছিলেন: ‘তিনি যেন কোথাও থিতু নন—না নিজের মাথায়, না আমাদের এই আধুনিক যুগে, না প্রাচীন গ্রিক জগতে।’ এটা কি সত্য?
অ্যান কারসন: পানির নিচেই আমি নিজেকে সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করি!
প্রশ্ন: ছোটবেলায় আপনি অস্কার ওয়াইল্ডের ভীষণ অনুরাগী ছিলেন। এখনও কি তাই?
অ্যান কারসন: সম্প্রতি ‘আর্টঅ্যাঞ্জেল’-এর জন্য অন্যদের সঙ্গে একটা প্রকল্পে কাজ শেষ করলাম। অস্কার ওয়াইল্ড রিডিং জেলে যে সময়টা কাটিয়েছিলেন, তার স্মরণে জেলখানা থেকে লেখা কারও একটি চিঠি রচনার কাজ ছিল ওটা।
প্রশ্ন: স্মৃতিকে ধরে রাখা বা স্মরণ করার ক্ষেত্রে কবিতা কতটা উপযোগী?
অ্যান কারসন: আমি শিল্পকে মনস্তাত্ত্বিক নিরাময়ের মাধ্যম বা থেরাপি বলে বিশ্বাস করি না।
প্রশ্ন: আপনি বক্সিং পছন্দ করেন, কেন?
অ্যান কারসন: ওটা একটা সাময়িক মোহের মতো ছিল, সময় কেটে গেছে, মোহই কেটে গেছে।
প্রশ্ন: আপনি এবং আপনার স্বামী দাবি করেন যে যৌথভাবে কাজ করা বা ‘কোলাবোরেটর’ হওয়া শেখানো যায়। কিন্তু যৌথ কাজ কি সত্যিই শেখানো সম্ভব?
অ্যান কারসন: না, শেখানো যায় না। এটা কেবল সরাসরি করতে হয়। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের এমন কিছু কাজ দিই যা তাদের একসঙ্গেই সম্পাদন করতে হয়।
প্রশ্ন: শুনেছি আগ্নেয়গিরির প্রতি আপনার চিরকালের এক অদ্ভুত ফ্যান্টাসি বা মুগ্ধতা রয়েছে। এর শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
অ্যান কারসন: সেই সময়ে আমি ছবি আঁকা নিয়ে মেতে ছিলাম। আর যা-ই হোক, আগ্নেয়গিরির ছবি আঁকা কিন্তু ভীষণ সহজ!
প্রশ্ন: আপনি কি জেনেশুনে এমন কোনো আবেগঘন বিষয়বস্তু খোঁজেন যা থেকে কবিতা তৈরি হতে পারে? আর এমন বিষয়বস্তু শেষ হয়ে যাওয়ার কি কোনো আশঙ্কা থাকে?
অ্যান কারসন: ‘জেনেশুনে’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। কারণ প্রজ্ঞা বা অন্তর্দৃষ্টিই বোধহয় আমাদের জানার সবচেয়ে গভীর রূপ। আর রসদ ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকির কথা বলছেন? এ সম্পর্কে আমিই কি সবশেষে জানতে পারব না?
প্রশ্ন: আপনার ‘শর্ট টক অন মোনা লিসা’ কবিতাটি আমার বেশ প্রিয়। মোনা লিসা কি এখনো আপনার কাছে এক ধাঁধা হয়ে আছে?
অ্যান কারসন: মোনা লিসাকে আমার কখনোই পছন্দ ছিল না। সেই অপছন্দ এখনো অব্যাহত আছে।
প্রশ্ন: আপনার উত্তরগুলো দেখে যা মনে হচ্ছে, আপনি কি সংক্ষিপ্ততা বা স্বল্পভাষিতাকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন?
অ্যান কারসন: সংক্ষিপ্ততা নিয়ে সংক্ষিপ্ত কথা... ত্বক থেকে অ্যালকোহল যেমন ঝটপট উবে যায়, ঠিক তেমনি দ্রুততার সঙ্গে মূল ত্বকের স্পর্শ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো। উদাহরণ হিসেবে এমিলি টেনিসনের দাদির কথা বলা যায়; ১৭৬৫ সালের ২০ মে তার বিয়ের দিনে ডায়েরির পাতায় তিনি লিখেছিলেন: “অ্যান্টিগনে পড়া শেষ করলাম, বিশপকে বিয়ে করলাম।”
- অ্যান কারসন
- নোবেল পুরস্কার
- সাহিত্যে নোবেল
- কবিতা
- কানাডীয় কবি
লেখাটি কেমন লাগল?
- ১টি ভালোবাসা
- এখনও কোনো রেটিং নেই

লেখক
কবি
মূলত গল্পকার। এখন চিত্রনাট্য লিখেন। থাকেন ঢাকা শহরে। বেড়ে উঠা বাংলাদেশের বনঘেরা এক উপশহরে।
মন্তব্য
মন্তব্য লোড হচ্ছে…