মেষপালক
গদ্য

জীবনানন্দ দাশ: এক সখ্যের আলেখ্য

বাবা বলেছিলেন, জীবনানন্দ তার শব্দের মতো নিজেও ধূসর ছিলেন।

সেলিম জাহান

৭ মিনিটে পড়া

জীবনানন্দ দাশ: এক সখ্যের আলেখ্য
জীবনানন্দ দাশের প্রতিকৃতি, স্কেচ: সত্যজিৎ রায়।

আমার প্রয়াত পিতা অধ্যাপক সিরাজুল হক ও কবি অধ্যাপক জীবনানন্দ দাশ বরিশাল বি.এম. কলেজে সহকর্মী ছিলেন চল্লিশের দশকের শেষার্ধে। বাবা ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের, জীবনানন্দ দাশ ইংরেজির।

আমার তরুণ অকৃতদার পিতা সবে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে ঢাকা থেকে বরিশাল গেলেন বি.এম. কলেজে অধ্যাপনার জন্য; সেই একই জাহাজে তার সতীর্থ বন্ধু শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী যাচ্ছিলেন খুলনা বি.এল. কলেজে অধ্যাপনা করতে। কবি জীবনানন্দ দাশ তার কিছুদিন আগে দ্বিতীয়বারের মতো কলকাতা থেকে এসে বি.এম. কলেজে যোগদান করেছিলেন।

আমার বাবা ভীষণ স্বল্প কথার মানুষ ছিলেন। ঠিক গল্প করার লোক ছিলেন না, গল্প করতেও পারতেন না। অনেকটাই নিভৃতচারী। তার জীবনের গল্পও আমরা বেশিরটাই শুনেছি আমার মায়ের কাছে। তার শৈশবের কথা এবং আমার পিতার ছোটবেলার কথা আমি শুনেছি আমার পিতামহী ও পিতার কনিষ্ঠ পিতৃব্যের কাছ থেকে। তাও ছাড়া ছাড়া কুড়িয়ে বাড়িয়ে শোনা।

শুনেছি বাবা যখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বি.এ. ক্লাসের ছাত্র, তখন তাদের পাঠ্য ছিল থমাস হার্ডির ‘দ্য মেয়র অব কাস্টারব্রিজ’ (The Mayor of Casterbridge)। সেটি পড়াতে এলেন সদ্য এম.এ. পরীক্ষা শেষ করা পাবনার জেলা প্রশাসক আবদুল হালিম চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তি ছাত্র কবীর চৌধুরী। কিন্তু আমার পিতা যে কেন ফেনী কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে পাবনায় বি.এ. পড়তে গেলেন, তা আমরা জানি না। তার পিতৃব্যদের পাবনায় ব্যবসা ছিল, এটুকু শুনেছি।

নিজের কথা বলার ব্যাপারে প্রচণ্ড অনীহা ছিল আমার বাবার। নিজের অধ্যাপনা, পড়াশোনা, বাড়িঘর নিয়েই থাকতেন ভদ্রলোক। নোয়াখালীর নিজের শেকড়ের প্রতি প্রচণ্ড টান ছিল তার। বহুদিন আমরা জানতেই পারিনি যে কবি জীবনানন্দ দাশ আর তিনি দু’বছর বি.এম. কলেজে সহকর্মী ছিলেন। এ কথাটি আমি প্রথম শুনি আমার কৈশোরে বি.এম. কলেজের বহু পুরনো কর্মী কৈলাশ কাকার কাছে। ১৯৪০ সাল থেকে কৈলাশ কাকা কলেজে কাজ করতেন।

তার মতে, কবি জীবনানন্দ দাশ আর আমার বাবা খুব কম কথা বলার মানুষ ছিলেন বলে, দু’জনের মধ্যে এক ধরনের সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে। কৈলাশ কাকা বলতেন যে, প্রায়ই যেখানে দেখা যেত যে বি.এম. কলেজের শিক্ষক বিশ্রামাগারের বিশাল সেগুনকাঠের চারদিক ঘিরে অন্যান্য শিক্ষকেরা উচ্চস্বরে উত্তপ্ত আলোচনা করছেন, সেখানে কবি জীবনানন্দ দাশ ও আমার বাবা এক কোনায় দুটো আরামকেদারায় বসে মৃদুস্বরে গল্প করছেন।

ওই কথার সূত্র ধরেই কবি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তার জানাশোনার প্রসঙ্গটি জিজ্ঞেস করলে তিনি টুকরো টুকরো করে কিছু কিছু স্মৃতিকথা বলেছিলেন। বয়সে কবি আমার বাবার চেয়ে বেশ বড় ছিলেন। বাবা তাকে ‘দাশ বাবু’ বলে ডাকতেন আর তিনি বাবাকে ‘হক সাহেব’ বলতেন। বাবার মুখে শুনেছি কবি জীবনানন্দের ডাকনাম ছিল ‘মিলু’।

বাবা এবং আরও ক’জন তরুণ অধ্যাপক তখন থাকতেন ব্রজমোহন কলেজের মূল ভবন ছাড়িয়ে দিগন্ত বিস্তৃত একটি মাঠের মাঝে একটি একতলা হলুদ বাড়িতে। ওই বাড়িটি আমি ষাটের দশকেও দেখেছি। হিন্দু হোস্টেল ছাড়িয়ে অনেকটা পোড়ো বাড়ির মতো। সেখান থেকে কোনাকুনিভাবে হেঁটে মুসলিম গোরস্থানের মাঝ দিয়ে গেলে ‘ধানসিঁড়ি’ ২০ মিনিটের রাস্তা।

মাঝে মাঝে কবি বাবার কাছে ওই বাড়িতে আসতেন। সকালে কবি প্রাতঃভ্রমণে বেরোতেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি চলে আসতেন বাবার কাছে চা খেতে। বাবার একটা পুরনো আমলের পেতলের স্টোভ ছিল। তিনি তাতে চা বানাতেন। দু’কাপ চা নিয়ে দু’জনে বসতেন বারান্দায়।

আমার পিতামহী তার পুত্রকে একটি কাসার গেলাস দিয়েছিলেন। কবি সেই গেলাসে চা খেতে ভালোবাসতেন। গরম গেলাসটি ধরতেন ধুতির খুঁট দিয়ে। চা খেয়েই উঠে পড়তেন অন্যান্য শিক্ষকদের উঠে পড়ার আগেই। বেশি লোকজনের সান্নিধ্য তিনি পছন্দ করতেন না, ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলতেন।

সুবেশ হয়েই তিনি বাবার কাছে আসতেন বলে শুনেছি। কিন্তু ঘরে ঢোকার পরে একটা বিপত্তি হতো। বাবার ঘরে একটি লম্বামতো গদি আঁটা হাতলবিহীন বেঞ্চি ছিল। কবি ঘরে ঢুকেই ওটাতে বসতেন। কিন্তু একেবারে কোনায় গিয়ে—বাবা বলতেন যে, মনে হতো, তিনি পড়েই যাবেন। বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি বেঞ্চির মাঝে বসতেন না, সারা বেঞ্চি খালি থাকলেও। বাড়ির অন্যান্য অধ্যাপকেরা এটা নিয়ে হাসিঠাট্টা করতেন, কিন্তু কবি নির্বিকার।

বাবা বলতেন, একা থাকলে কলেজের শিক্ষকদের বিশ্রামাগারে একটা কোনায় বসতেন কবি জীবনানন্দ দাশ এক কাপ চা নিয়ে। অন্য অধ্যাপকেরা যখন জমিয়ে গল্প করছেন, তখন কবি কেমন যেন আনমনা হয়ে কী একটা ভাবতেন তন্ময় হয়ে। অন্যদের গালগল্পে যেতেন না, এমনকি আমন্ত্রণ জানালেও না। তবে বাবা বলেছেন যে, “দাশবাবু হঠাৎ করে হো হো করে জোরে হেসে উঠতেন।” তখন অন্য অধ্যাপকেরা অবাক হলে, কবি কেমন যেন বিব্রত হয়ে পড়তেন।

বড় লাজুক ছিলেন তিনি। অন্য মানুষের সামনে পড়ে গেলে কেমন যেন অস্বস্তি হতো তার। নিজেকে নিয়ে থাকলেই সবচেয়ে আরাম বোধ করতেন। বাবা ঠাট্টা করতেন যে, রাস্তার এপারে-ওপারে দু’জনে থাকলে দৃষ্টি এড়াতে প্রাণপণ চেষ্টা করতেন কবি। “কেমন আছেন, দাশবাবু?” এমন সাধারণ প্রশ্ন করলেও কেমন যেন ঘেমে উঠতেন তিনি।

নতুন বাজারে দেখা হতো দু’জনার কোনো কোনো সকালে। বাবাকে দেখলেই খুশি হয়ে উঠতেন তিনি, কারণ কবি মাছের দরদাম করতে পারদর্শী ছিলেন না। তাই চুপিচুপি বাবাকে বলতেন, “হক সাহেব, আমাকে একটা মাঝারি মাছ কিনে দিন না?” এ কথাটা বলার সময়ে বাবার মুখটা, চোখের দৃষ্টিটা, গলার স্বরটা কেমন যেন নরম হয়ে আসতো।

বাবা বলেছিলেন, জীবনানন্দ তার শব্দের মতো নিজেও ধূসর ছিলেন। রাতে চায়ের দোকানে শিক্ষকেরা গল্প করার সময় মাঝেমধ্যে দেখতেন অন্ধকারে ছায়ার মতো কেউ হেঁটে যাচ্ছে। অতিক্রম করে গেলে বোঝা যেত সে আর কেউ নয়, নিজের শব্দের মতো মানুষটা জীবনানন্দ দাশ।

রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে কবির গভীর আগ্রহ ছিল। ভারতীয় নানা দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর চিন্তাচেতনার ওপরে তার ভালো দখল ছিল। বাবার কাছে তিনি পাশ্চাত্যের নানা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর ধ্যানধারণা সম্পর্কে জানতে চাইতেন। রাষ্ট্রচিন্তার বিবর্তন তাকে অবাক করত। ভারত-বিভাজনে তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন। সে সময়ে দেশভাগের টানাপোড়েনে তিনি বিচলিত ছিলেন। তাই ক্রমাগত বরিশাল-কলকাতা করেছেন। তার এই অনিশ্চয়তার কথা তিনি বাবাকে বলেছেন, নানা কবিতাতেও এর প্রতিফলন ঘটেছে।

একটা সময়ে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা ও শব্দের প্রতি তার ভীষণ কৌতূহল ছিল। “কেন, কে জানে?” বাবা জিজ্ঞেস করেও কোনো সদুত্তর পাননি। হয়তো কবিতায় নতুন নতুন আঞ্চলিক শব্দমালা ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, কিংবা কোনো কিছু লেখার পরিকল্পনা ছিল নোয়াখালীর পটভূমিতে। তিনি বাবাকে বলেছিলেন যে, ১৯৪৬ সালের নোয়াখালীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তার চিত্তকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বাবার কাছে ওই দাঙ্গা সম্পর্কে জানতে চাইতেন। বাবার সঙ্গে এক ধরনের নৈকট্য অনুভব করতেন তিনি। বাবাকে তিনি বলতেন, “বরিশাল আর নোয়াখালী সহোদর, মেঘনার এপার-ওপার।”

একটা সময়ে বাবা সেই অকৃতদার অধ্যাপকদের আস্তানা ছেড়ে উঠে এলেন বৈদ্যপাড়ায় এক বাড়িতে। হলুদ-লাল দালানের হলদে কল্কে ফুলের লতানো সেই অনিন্দ্যসুন্দর বাড়িটি আমি শৈশবে দেখেছি। ১৯৪৯ সনে বাবা মাকে বিয়ে করে নোয়াখালী থেকে বরিশালে নিয়ে এলে কবি জীবনানন্দ দাশ কলকাতা থেকে একটা চিঠি লিখেছিলেন নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানিয়ে। সে চিঠি রক্ষিত হয়নি, কারণ তখনও অধ্যাপক জীবনানন্দ দাশের ভাগ্যে কবি জীবনানন্দের খ্যাতি জোটেনি।

শেষবার যখন পিতার সঙ্গে আমার দেখা হয়, তখনও জীবনানন্দ প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। নানা কথা হয়েছিল। একপর্যায়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বাবা বলেছিলেন, “চিনতে পারিনি তখন যে অত বড় একজন কবি ছিলেন!” তার কণ্ঠের আক্ষেপ লুকোনো থাকেনি। আমি মনে মনে বলেছিলাম, “আমরাও কি তাকে পুরোপুরি চিনতে পেরেছি?” ‘বিষণ্নতার কবি’, ‘ধূসর কবিতার কবি’, ‘রূপসী বাংলার কবি’, ‘শুদ্ধতম কবি’, কত কথাই তো বলি তার সম্পর্কে, কিন্তু পুরোপুরি কি এখনও ধরতে পেরেছি কবি জীবনানন্দ দাশকে?

ধরন ও বিষয়:
  • কবিতা
  • কবি
  • জীবনানন্দ দাশ
  • বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ
  • বরিশাল
  • নোয়াখালী
  • পাবনা
  • ফেনী
  • জীবনানন্দ
  • বরিশাল বি.এম. কলেজ

লেখাটি কেমন লাগল?

  • ০টি ভালোবাসা
  • এখনও কোনো রেটিং নেই

সেলিম জাহান

লেখক

সেলিম জাহান

অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

মানবউন্নয়ন বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ। অর্থনীতি, উন্নয়ন ও সমসাময়িক বৈশ্বিক বাস্তবতা নিয়ে লেখালেখি করেন।

মন্তব্য

মন্তব্য লোড হচ্ছে…